ড্রাগন চাষ করে লাভবান হউন

ড্রাগন চাষ করে লাভবান হউন,দীর্ঘজীবী ড্রাগন ফল উঁচু জমিতে ছোট জায়গায় চাষ করা যায়। ড্রাগন ফুলটি রাতের রানির মতোই ফোটে। ফুলের আকৃতি লম্বাটে এবং রঙ সাদা ও হলুদ। প্রতি বিঘা জমিতে ২০০টি ড্রাগন ফলের গাছ লাগানো যায়। ড্রাগন ফল বীজ এবং কাটিং দ্বারা চাষ করা যেতে পারে। ফুল ডিম্বাকৃতি ফল দেয়। ফলটি হালকা মিষ্টি এবং ক্যালোরিতে কম এবং কালোজিরার মতো অসংখ্য বীজ রয়েছে। একটি গাছে বছরে ৬০ থেকে ১০০কেজি ফল ধরে। ড্রাগন গাছ তাদের খাবারের ৫০% বাতাস থেকে পায়। অবশিষ্ট খাদ্য জৈব সার থেকে সংগ্রহ করা হয়। এ ফলের চারা এখন দেশে পাওয়া যাচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্রুট জামোর প্লাজমা সেন্টারে।

ড্রাগন চাষ করে লাভবান হউন

ড্রাগন ফলের গাছ দেখতে অনেকটা ক্যাকটাসের মতো। ডিম্বাকৃতি উজ্জ্বল গোলাপি রঙের এই ফলের নামও অদ্ভুত। সাধারণত ড্রাগন ফল ডায়াবেটিস প্রতিরোধে খুবই উপকারী। এতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। গবেষণায় আরও জানা যায় যে ড্রাগন ফল দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে স্থানীয়। ১০০ বছর আগে এই ফলের বীজ ভিয়েতনামে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।

সেখান থেকে ড্রাগন ফলের চাষাবাদ হয়। ড্রাগন ফলের সবচেয়ে বেশি চাষ হয় ভিয়েতনামে। এ ছাড়া তাইওয়ান, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, চীন, ইজরায়েল, অস্ট্রেলিয়ায় ড্রাগন ফলের চাষ হচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর নির্দেশে মন্ত্রণালয় তখন বড়াইগ্রাম উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম কামরুজ্জামান, দেশের খ্যাতিমান ফল গবেষক ও উদ্ভাবককে ভিয়েতনামে পাঠায় ড্রাগন চাষের কৌশল জানতে এবং আমাদের দেশে এর সম্প্রসারণ।

এ প্রসঙ্গে কামরুজ্জামান বলেন, “দেশের প্রথম কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী বিদেশ থেকে উন্নত জাতের কিছু ড্রাগন ফলের চারা এনেছিলেন। পরে আমরা বিদেশে গিয়ে হাতেকলমে এর চাষ শিখে দেশেই চাষ শুরু করি।” এখন আধুনিক উদ্যানপালন। কেন্দ্রে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা এবং চীন থেকে আনা বিভিন্ন জাত ছাড়াও লাল, সাদা, গোলাপী, হলুদ এবং বহু জাতের ১২টি বিভিন্ন জাতের ২০০০টিরও বেশি গাছ রয়েছে। রঙ: ড্রাগন ফল পাঁচটি রঙে উৎপাদিত হয়। উৎপাদিত ড্রাগন। যাচ্ছে রাজধানীর কাওরান বাজার ও শ্যাম বাজারে।সেখান থেকে পাঁচ তারকা হোটেল, অভিজাত ডিপার্টমেন্টাল স্টোরসহ সারাদেশে।

ড্রাগন চাষ বেশি লাভজনক

যদিও জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে দোআঁশ মাটি ড্রাগন ফল জন্মানোর জন্য সবচেয়ে ভালো, ড্রাগন ফল প্রায় যেকোনো ধরনের মাটিতে জন্মানো যায়। প্রকৃতিতে লতানো ড্রাগন গাছ। ড্রাগন ফলের চাষ করা খুবই সহজ। অন্যান্য ফসলের তুলনায় কৃষকদের শ্রম অনেক কম, আয়ও বেশি। ড্রাগন ফলের চারা রোপণের উপযুক্ত সময় জুন-জুলাই। আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ফল সংগ্রহ করা যায়। বো ড্রাগন ফল(সাদা) এবং বো ড্রাগন ফল(লাল)।

বাংলাদেশে এ দুটি জাত চাষ করা হচ্ছে। কাটিং ড্রাগন চাষের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত। কাটিং থেকে জন্মানো গাছে ফল ধরতে ১২থেকে ১৮ মাস সময় লাগে। সঠিক প্রয়োগে একর প্রতি ৬ থেকে ৭ টন ফলন পাওয়া যায়। দাম প্রতি কেজি ২০০ টাকা হলেও এর বাজারমূল্য ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা। খরচ ৬ থেকে ৭ লাখ বাদ দিলেও নিট মুনাফা হবে ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা। আমাদের দেশে ড্রাগন ফল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।

অনেকেই সফল

ঢাকার সাভারের আশুলিয়ার মরিচকাটা গ্রামে প্রায় ১৬,৫০০ গাছ লাগিয়ে ফল চাষি ইতিমধ্যে সাফল্যের মুখ দেখতে শুরু করেছেন। মাত্র এক বছরেই গাছগুলো ফলদায়ক হয়ে উঠছে। জানা গেছে, ফটিকছড়ির হালদা ভ্যালি চা বাগানে ড্রাগন ফল চাষে সাফল্য এসেছে। চা বাগানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রাইম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নাদের খান শখ হিসেবে ২০০৪ সালে থাইল্যান্ড সফরের সময় ৮০০টি ড্রাগন ফলের চারা সংগ্রহ করেন। ড্রাগন ফলের দেশ হিসেবে পরিচিত থাইল্যান্ডে একটি গাছে পুরোপুরি ফল ধরতে সময় লাগে তিন বছর। ২০০৯সালে, তিনি থাইল্যান্ড থেকে ড্রাগন ফলের চারা নিয়ে আসেন এবং রোপণের এক বছরের মধ্যে ফল ধরে দেখে হতবাক হয়ে যান। তাই রপ্তানিযোগ্য এ ফলের ভবিষ্যৎ বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে বেশ আশাবাদী তিনি।

পাহাড়ে ড্রাগন চাষ করা

সুখবর হলো রাঙামাটির কাপ্তাই কৃষি গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানীরা ড্রাগন ফলের পরীক্ষামূলক গবেষণায় সফল হয়েছেন। তাদের মতে, পাহাড়ি মাটি এ ফল চাষের জন্য খুবই উপযোগী। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে এ ফলের ব্যাপক চাষাবাদ সম্ভব। পাহাড়ে বাড়ছে বিদেশি ফল ড্রাগনের চাষ। বান্দরবান কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, বিদেশী ফল হলেও পাহাড়ি আবহাওয়া ও মাটি উভয়ই ড্রাগন চাষের জন্য খুবই উপযোগী। পাহাড়ে ড্রাগন ফল চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। পোকার আক্রমণ ও কম পানি সেচের কারণে পাহাড়ি কৃষকরা এ চাষে আগ্রহী। স্বল্পমেয়াদে অধিক লাভজনক হওয়ায় বান্দরবানে পাহাড়ি চাষিরা জুম চাষ ছেড়ে ড্রাগন ফলের চাষে ঝুঁকছেন।

বরেন্দ্র অঞ্চলে ড্রাগন চাষ

খরাপ্রবণ এলাকা হওয়ায় বরেন্দ্র অঞ্চলে খরা সহনশীল ক্যাকটাস প্রজাতির ভালো ফলন হয়, তাই এখানে ‘ড্রাগন’ চাষের সম্ভাবনা রয়েছে। রাজশাহীর কোনো কোনো এলাকায় স্থানীয়দের কাছে অপরিচিত এ ফলের চাষ হয়েছে। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী অঞ্চলে সীমিত পরিসরে ড্রাগন ফলের চাষ শুরু হয়েছে। প্রতি বর্গমিটারে খরচ দুই লাখ টাকা এবং বার্ষিক আয় পাঁচ লাখ টাকা।

ছাদে ড্রাগন চাষ

ড্রাগন ফল জমির পাশাপাশি ছাদেও চাষ করা যায়। বাড়ির ছাদে টবে চাষ করে সফলতা পেয়েছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুস ছালাম। আবদুস ছালাম ২০১১ সালের এপ্রিলে গাজীপুর ন্যাশনাল এগ্রিকালচারাল ট্রেনিং একাডেমি (NATA) থেকে ৩টি চারা নিয়ে টবে রোপণ করেন। ২০১২সালে, ফলটি ফুল ফোটে। টবে রোপণ করা প্রতিটি ফলের ওজন ১৫০ গ্রাম থেকে ৩০০গ্রাম পর্যন্ত পরিবর্তিত হয়। সাঁথিয়া অর্থাৎ পাবনা জেলায় তিনিই প্রথম যিনি সফলভাবে একটি ভবনের ছাদে ড্রাগন ফল চাষ করেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জামোর প্লাজমা সেন্টারের পরিচালক থাইল্যান্ড, ফ্লোরিডা ও ভিয়েতনাম থেকে ড্রাগন জাত নিয়ে আসেন। এম এ রহিম বাংলাদেশে ড্রাগন ফল নিয়ে নিরলস গবেষণার মাধ্যমে দেশে চাষের উপযোগী ফলের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। বিদেশে ড্রাগন চাষে সাফল্যের ফলে জামার প্লাজমা সেন্টার নাটোর, রাজবাড়ী, রাঙ্গামাটিসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ড্রাগন চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০০৯ সালে, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বড়াইগ্রামে হাবিদুল ইসলামের বাড়িতে বাংলাদেশে প্রথম আনুষ্ঠানিক ড্রাগন ফলের চাষের উদ্বোধন করেন।

পরিশেষে

২০০৭ সালে বাংলাদেশে প্রথম ড্রাগন ফলের গাছ আনা হয়। দেশে বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন চাষ করা সম্ভব হলে পুষ্টি চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলেও মনে করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষের জন্য বাউ ড্রাগন ফ্রুট-১ (সাদা), বাউ ড্রাগন ফ্রুট-২ (লাল), হলুদ ও গাঢ় লাল ড্রাগন ফলের চাষ বাড়ানো যেতে পারে। সুস্বাদু ও পুষ্টিকর এ ফলের চাষ ব্যাপকভাবে গড়ে উঠলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে ড্রাগন ফল রপ্তানি করা সম্ভব বলে মনে করেন কৃষিবিদরা।

Related Articles

Stay Connected

0FansLike
3,761FollowersFollow
0SubscribersSubscribe

Latest Articles